সুতপার খুব মন খারাপ। দাদু হঠাৎই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ডাক্তারবাবু কি হয়েছে কিছু নিশ্চিত করে বলতে পারেন নি। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি সুতপার ভালো নাম সুতপা ব্যানার্জী । ভূগোলে মাস্টার ডিগ্রী করছে। বয়স বছর কুড়ি।মহামারী পরিস্থিতিতে পড়াশোনা অনলাইনেই হচ্ছে। পড়াশোনার ফাঁকে সুতপা মাঝে মাঝে ফেসবুকেও ঢোকে।এ এক অন্যরকম দুনিয়া। সবাই খুব হাসিখুশি পরিতৃপ্ত জীবন নিয়ে।সুন্দর সুন্দর সাজপোশাকে ঘুরতে যাওয়ার ছবি পাঠায় অনেকে। অনেকে আবার ভালো ভালো খাবারের।শিল্পকলায় পারদর্শীরা তাদের নাচ, গান, আঁকা, আবৃত্তি তুলে ধরে ফেসবুকের পাতায়।সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় অনুভূতি।তবে এর ব্যতিক্রমও আছে।সুতপার এক বান্ধবী সুতপাকে মেয়েদের একটা গ্রুপে যুক্ত করেছিল।সুতপা এই গ্রুপে ঢুকে দেখে অনেকে নিজের মনের আনন্দের পাশাপাশি দুঃখকেও সকলের সাথে ভাগ করে নেয়। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে অন্যদের কাছে পরামর্শ পায়। সুতপা যদিও কোনদিন কিছু লেখেনি গ্রুপে।
কিন্তু খুব প্রাণবন্ত আর আপন লাগে এই মনন গ্রুপকে। যাই হোক ডাক্তার এর কথামত সেদিন দাদুর টেস্টগুলো করিয়ে বাড়ি আসে সুতপা। তারপর ভরসা পেতে মনন গ্রুপে লেখে ‘আমি সুতপা ।আমার দাদু খুব অসুস্থ। ডাক্তারবাবুর কথামত টেস্ট করিয়েছি। রিপোর্ট পাই নি এখনও। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তোমরা সবাই প্লিজ প্রে করো দাদু যেন খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায়।“ কথাগুলো লিখেই সে মোবাইল রেখে দেয়। দৈনন্দিন কাজ আর দাদুর দেখাশোনার পর সন্ধ্যাবেলা সে আবার ফেসবুকে দেখে অনেকে মন্তব্য করেছে তার লেখাটাতে। সবাই লিখেছে খুব শিগগিরই তোমার দাদু ভালো হয়ে যাবে। এত চিন্তা করো না। সুতপার মনটা একটু আশ্বস্ত হয়। অনেকগুলো মানুষের ভরসা পায় সে। রাতেরবেলা ঘুমতে যাওয়ার আগে ম্যাসেঞ্জারে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ম্যাসেজ আসে সুতপার ফোনে। যে ম্যাসেজ করেছে তার নাম অনামিকা চ্যাটার্জি। ম্যাসেজে লেখা “আমি অনামিকা “মনন” গ্রুপের একজন সদস্যা। তোমার দাদু খুব অসুস্থ শুনলাম গ্রুপ থেকে। তুমি যদি চাও আমার বন্ধু হতে পার। আমিও তোমার মতই একা। মন খুলে আমার সাথে কথা বলতে পার।“ সুতপা ভারী অবাক হয়। মনে মনে ভাবে মেয়েটিকে জাদু জানে? কি করে জানল যে সে নিঃসঙ্গ ! ভাবনামাত্রই ম্যাসেজ করে বসে অনামিকাকে। “আপনি জানলেন কি করে আমি একা? আমি তো “মনন”এ বলেছি আমার দাদু অসুস্থ, তাই সবাই যেন প্রার্থনা করে”। দুমিনিট বাদেই অনামিকার জবাব এল , “বন্ধু আমায় তুমি করে বল কেমন? আপনি বললে বন্ধুত্ব হয় না। আর কি করে জানলাম যে তুমি একা? দোষ নিও না বন্ধু । আসলে তোমার লেখাটা পড়ে আমি একটু তোমার ফেব প্রোফাইলে ঢুকেছিলাম। দেখলাম একটাই পাবলিক পোষ্ট। আর সেটা হল তোমার প্রোফাইল পিকচার। অনেক পুরনো ছবি দেখে মনে হল। ফটোতে তুমি মাঝখানে আর দুপাশে তোমার দাদু ঠাকুমা। তুমি ফটোতে ক্যাপশ্যান দিয়েছ “ আমার দুনিয়া আমার দাদু ঠাকুমা ।“ জানি দাদু ঠাকুমা নাতি নাতনির কাছে স্বয়ং ভগবান । কিন্তু তাও তোমার মা বাবার কারোর কোন ছবি দেখলাম না , তাই মনে হল তুমি একা । জানি আমি ভুল ও হতে পারি । “ সুতপা আবারও অবাক হল । একটা অপরিচিত মেয়ে তার সামান্য গ্রুপ পোষ্ট দেখে প্রোফাইল ঘুরে এসে তাকে ম্যাসেজ করেছে! আবার সে যে একা সেটা বুঝতেও পেরেছে! কি জানি বাবা কি মতলব আছে মনে!সুতপা আর কোনও রিপ্লাই করে না। কিন্তু পরদিনই সকালে দেখে ম্যাসেঞ্জারে অনামিকার ম্যাসেজ । একটা সুন্দর কোটেশান , “ we have always held to the hope, the belief, the conviction that there is a better life , a better world , beyond the horizon .” – Franklind Rosevelt .. বাংলায় যার অর্থ করলে দাঁড়ায় , আমাদের সবসময় একটা আশা , একটা দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে দিগন্তের ওপারে বুঝি উৎকৃষ্টতর পৃথিবী আছে। ম্যাসেজটা পড়ে সুতপা উত্তর দিল , বন্ধু আমাদের কবিগুরুই তো বলে গেছেন এই কথা “ নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস”। একটু পরেই অনামিকা লিখল ঠিক বলেছ বন্ধু । রবিঠাকুর মানুষের সবরকম অনুভূতি নিয়ে লিখে গেছেন। উনি তো প্রাণের ঠাকুর। যাই হোক তোমার দাদু এখন কেমন আছেন? ওনার টেস্ট এর রিপোর্ট এসেছে? সুতপা জানায় ইউরিন কালচারের রিপোর্ট এসেছে। ইনফেকশান আছে। আরও কিছু রিপোর্ট পরে আসবে। অনামিকা লেখে, দাদু নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবেন তাড়াতাড়ি । সেদিনের মত দুজনের এইটুকুই কথাবার্তা হয়। পরদিন যথারীতি ফোন খুলেই সুতপা দেখে অনামিকার ম্যাসেজ _ “You will face many defeats in life but never left yourself be defeated”. মুচকি হেসে তৎখনাৎ সুতপা উত্তর দেয় “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা , বিপদে আমি না যেন করি ভয়। দুঃখ তাপে ব্যাথিত চিতে নাই বা দিলে স্বান্তনা দুঃখে যেন করিতে পারি জয়”। এইভাবেই দিন কাটতে থাকে। সুতপার দাদু ডাক্তারের চিকিৎসায় আর সকলের প্রার্থনায় সুস্থ হয়ে ওঠেন কিছুদিনের মধ্যেই । সুতপা আর অনামিকার বন্ধুত্ব এখন ফেসবুক এর গণ্ডি ছেড়ে personal contact list এ ঢুকে পড়েছে। তারা প্রায়ই ফোনে কথা বলে । সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করে। একদিন সুতপাকে তার দাদু বলে _ তপা , তোর সেই বন্ধুকে একদিন নিমন্ত্রন করিস তো। আমাদের বিপদের দিনে তোকে মনে সাহস যুগিয়েছে । এখনকার ব্যস্ততার যুগে এটাই বা কম কি? সুতপা বলে হ্যাঁ দাদু একদম ঠিক বলেছ। আজকালকার দিনে এমন বন্ধু পাওয়া বিশেষ সৌভাগ্যের । তাহলে সামনের রোববার ডাকি? দাদু ঠাম্মা সমস্বরে বলে ওঠেন হ্যাঁ হ্যাঁ একদম সকাল থেকে আসতে বলিস। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি সুতপা আর অনামিকা ফোনে যত কথাই বলুক বা একে অপরকে ম্যাসেজ করুক কেউ কারোকে কখনো ভিডিও কল করে নি কখনো। সুতপার অনেক পুরনো একটা প্রফাইল পিকচার অনামিকা দেখলেও অনামিকার কোনও ছবি সুতপা দেখে নি। যাই হোক নির্দিষ্ট দিনে সুতপার কথামত অনামিকা ওদের বাড়ি আসে। কলিং বেল বাজা মাত্র দরজা খোলেন সুতপার ঠাকুমা আভারাণী দেবী। বিস্ময়ের বিষয় হল এই যে দরজা খুলে তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। আর নড়েন না। পাশের ঘরেই ছিল সুতপা আর ওর দাদু অমলকান্তি বাবু । দাদু নাতনিতে টিভি দেখছিল। তারাও চলে আসে ততক্ষণে ঠাকুমার পাশটিতে। “ও গিন্নি কে এল? তপার সেই বন্ধু বুঝি? ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ কেন? ঢুকতে দাও”। কথাকটি একসাথে বলে অমলকান্তি বাবু তার স্ত্রীর হাত ধরে পিছনে সরিয়ে আনেন। কিন্তু পরক্ষণেই সামনের দিকে তাকাতেই চমকে যান। এ যে এ যে তাদের তপা মানে সুতপার কার্বন কপি! তবে কি এই সুমনা ? কিন্তু তা কি করে হবে। মেয়েটি যে বলেছিল তার নাম অনামিকা ! মনে সাহস আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেন অমলকান্তি বাবু। কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন মা তোমার নাম কি সত্যিই অনামিকা? __ হ্যাঁ দাদু আমি অনামিকা । অনামিকা চ্যাটার্জী । অনামিকা উত্তর দেয়। অমলকান্তি বাবু আবার বলেন , “মা তোমার অন্য কোনও নাম আছে?” __ দাদু আমার ডাক নাম মনা। অনামিকা বলে। অমলকান্তি বাবু মনে মনে বিড় বিড় করেন মনা? মনা তো সুমনার ও ডাক নাম! আর কি বলল যেন পদবীটা ? চ্যাটার্জী? বৌমা শ্রীতমার বাপেরবাড়ির পদবী তো চ্যাটার্জীই ছিল ! মনে অনেকখানি আশা নিয়ে সুতপার দাদু অমলকান্তিবাবু বলেন “তোমার বাড়িতে কে কে আছেন মা?” কথাটি শোনামাত্র অনামিকার চোখদুটো হঠাৎ জলে ভরে ওঠে। ঠাকুমা আভারাণীদেবী এতক্ষণ ধরে দুজনকেই চুপচাপ লক্ষ করছিলেন। স্বামীর উপর রেগে গিয়ে বলেন – “দিলে তো মেয়েটাকে কাঁদিয়ে ? ওকে ঘরে ঢুকিয়ে বসতে দেবে কোথায় আগে সেসব না করে জেরা শুরু করে দিলে একেবারে। তুমি পারও বটে সত্যি” ! তারপর অ-নামিকার দিকে তাকিয়ে বলেন “এসো দিদিভাই ভিতরে এসে বসো। ওই বুড়ো লোকটার কথায় কিছু মনে কর না। উনি ওইরকমই”। ব্যানার্জী বাড়ির ডাইনিং রুমটা বেশ বড়। নতুন নতুন আসবাবে সজ্জিত। চোখে পড়ার মত পুরনো জিনিষ বলতে একটা বিরাট বড় কাঠের পুরনো বুকশেলফ । তাতে বিভিন্ন বিষয়ের বই ঠাসা। অনামিকা সোফাসেটে খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর একগ্লাস জল খেয়ে খানিক ধাতস্থ হয়। তারপর বলতে শুরু করে। _ “আসলে আমাদের বাড়িতে এখন আমি ছাড়া কেউ নেই। মা ছিলেন। গত হয়েছেন পাঁচ বছর হল। আর দাদু দিদা তো বহুবছর আগেই মারা গেছেন। জানো দাদু মা আমাকে একা মানুষ করেছে। বাবার ছবি পর্যন্ত ঘরে দেখিনি কখনো। বড় হওয়ার পর একদিন বাবার কথা জানতে চাওয়াতে মা শুধু বলেছিল, আমি যখন খুব ছোট তখন বাবার সাথে এক গুরুতর বিষয়ে ঝামেলা হওয়াতে আমাকে নিয়ে মা চলে আসেন। কিন্তু ঠিক কি হয়েছিল সেটা আমায় বলে নি”। অনামিকা একটু থামলে আভারাণী দেবী জিজ্ঞাসা করেন, “তোমার মায়ের নাম কি শ্রীতমা?” চমকে ওঠে অনামিকা। থতমত খেয়ে বলে হ্যাঁ ঠাম্মা । কিন্তু তুমি জানলে কি করে? আভারাণীদেবী স্মিত হেসে বলেন , “আমি তোমায় দেখেই বুঝেছি তুমি আমাদের আরেক দিদিভাই। সুমনা দিদিভাই। তুমি কি জানো দিদিভাই তোমার একটা জমজ বোন আছে? ওই যে দেখো দূরে দাঁড়িয়ে আছে সুতপা তোমার বন্ধু, ওই ওইই তোমার জমজ বোন। আর আমরা হলাম ঠাকুমা দাদু”। অনামিকা অবাক চোখে দূরে দাঁড়ানো সুতপাকে দেখতে থাকে। এতক্ষন ধরে এত কথা বলার মাঝে সে সুতপাকে লক্ষই করে নি। সত্যিই যেন তারই কার্বন কপি। ঠাকুমা মানে আভারাণীদেবী আবার বলতে শুরু করেন “তোমাদের বাবা সেদিন সত্যিই গর্হিত কাজ করেছিলেন। সেসব আর নাই বা জানলে এতদিন বাদে। আমার ছেলে তার পাপের শাস্তি পেয়েছে। ওই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায় সে। তোমাদের দুইবোনের নাম মিল দিয়ে তোমাদের বাবাই রেখেছিলেন। সুতপা আর সুমনা। সেদিনের পর তোমাদের মা তোমায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তোমার মা হয়ত সেদিনের ঘটনার পর অপমানে অভিমানে তোমার নাম বদলে দিয়েছিলেন। জানো তো দিদিভাই তোমাদের বাবা মারা যাওয়ার পর এই বুড়ো বুড়িতে তোমাদের কত খুঁজেছি। কিন্তু পাই নি। আজ ঈশ্বর এতদিন বাদে মুখ তুলে চাইলেন। এসো দিদিভাই তোমরা দুটি বোন মিলে একসাথে মিলেমিশে থাকো। আমরা আর কদ্দিন? এতো তোমাদেরই বাড়ি”। এতক্ষণ কথা বলে আভারাণী দেবী থামলেন। ততক্ষণে দুই বোনে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে।
অনলাইন ফ্রেন্ড-online friend
প্রদীপ কুমার চৌধুরী। গল্প খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeletethank you . khub khusi holam .
Deleteবেশ ভালো লাগল।
ReplyDeletethank you.
Delete