কলমে দেবযানী চক্রবর্ত্তী
মনীষা, মিনতির একরত্তি ছোট্ট মেয়ে। প্রথম মা হওয়ার আনন্দে আত্মহারা
হওয়ার পাশাপাশি মনীষা কিভাবে ভালো থাকবে , কিভাবে তাকে জগতের সকল খারাপ পরিস্থিতি থেকে
রক্ষা করবে সে কথাই সদা সর্বদা চিন্তা করে মিনতি দেবী। নিন্দুকেরা বলেন মেয়েকে ভালো
রাখার ব্যাপারে মিনতি দেবী একটু বাতিকগ্রস্ত ।কিন্তু সেসব কথায় মিনতি দেবী কোনও আমল
দেন না।দেড় বছরের মেয়েকে স্নান করিয়ে কপালে একটা বিরাট কাজলের টিপ আঁকেন যাতে কারোর
নাজর না লাগে। যদি কেউ তার মেয়েকে দেখে বলেন’ খুব সুন্দর লাগছে’, মিনতি দেবী তৎক্ষণাৎ
মেয়ের কড়ে আঙ্গুল নিয়ে দাঁতে আলতো চাপ দেন। যতই লোকে হাস্যকর বলুক এসবই তার মেয়েকে
ভালো রাখার প্রচেষ্টা !
মিনতি দেবীরা একটি দুকামরার ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন । স্বামী,
কন্যা, শ্বশুর, শ্বাশুরি নিয়ে তার ছোট্ট সংসার । তাদের মুখোমুখি ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন
এক নিঃসন্তান দম্পতি সমীর ও শম্পা ।শম্পা দেবী মিনতির চেয়ে বয়সে অনেক বড়। এখন ও সন্তান
হয় নি। অনেক ডাক্তার বদ্যি করেছে কিন্তু কোনও সুফল মেলে নি। এই শম্পা দেবীকে নিয়ে মিনতির
মনে এখন যত অশান্তি । মুখোমুখি ফ্ল্যাট বাড়ি , মুখোমুখি বেডরুমের জানালা। আর সেই জানালা
দিয়ে সুযোগ পেলেই শম্পা ছোট্ট মনীষা কে ডাকে , দুজনে জানালায় দাঁড়িয়ে ইশারায় কথা বলে।
এক রবিবার তো শম্পা দেবী নিজেই হাজির মিনতিদের ফ্ল্যাটে ।ঘরে ঢুকেই মনীষার হাতে একটা
ক্যাডবেরি দেয়। তারপর ছড়া বলে , গল্প বলে।ছোট্ট মনীষা খুশিতে ফেটে পরে।কিছুতেই শম্পা
দেবীকে সেদিন বাড়ি যেতে দিচ্ছিল না। কোনমতে বোঝানো হয় যে সে মাঝে মাঝে আসবে , তারপর
সে ছাড়া পায়। বিষয়টা মিনতি দেবীকে একসাথে ভাবিত ও ভীত করে তোলে । মিনতি মা ঠাকুমার
থেকে শুনে এসেছে যে নিঃসন্তান মহিলাদের নিজের ছেলে মেয়ের কাছে আসতে দিতে নেই কারণ অন্যের
ছেলেমেয়ের খুশিতে ওদের নাকি দীর্ঘশ্বাস পড়ে। নজর লেগে যায়। কিন্ত মিনতি কি করবে এই
ব্যাপারে? সে তো যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে। মনীষার অন্নপ্রাশনে সারা পাড়া নে্মন্তন্ন থাকলেও
সমীর বাবু আর শম্পা দেবীকে নেমন্তন্ন করা হয় নি। তাতেই তো বোঝা উচিত ছিল শম্পা দেবীর
যে ওরা ওদের উপস্থিতি পছন্দ করছে না।এইসব ভাবতে ভাবতে বেশ কিছু সময় চলে যায়। হঠাৎ কি
মনে হতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মনীষা পুরো ক্যাডবেরিটা খেয়ে ফেলেছে।হাতে যেটুকু লেগে
ছিল সেটুকু সে চাটছে খুব তৃপ্তির সঙ্গে। এতবড় ক্যাডবেরিটা একসাথে খেয়ে ফেলায় মনীষার
বিকেল থেকে পেটের গন্ডগোল শুরু হয়। মিনতির মনে হয় শম্পা দেবীই এর জন্য দায়ী।তার মনে
হয় মা ঠাকুমা ঠিকই বলতেন নিঃসন্তান মেয়ের দীর্ঘ
শ্বাস পরে বাচ্ছার ওপর। মিনতির আর ভাবতে পারে না। আর বড় কোনও অমঙ্গল যাতে না হয় তার
জন্য এই ঘটনার পর থেকে মিনতি তাদের ঘরের উত্তরদিকের জানালা বন্ধ রাখত যাতে তার মেয়ের
সাথে শম্পা দেবীর চোখাচুখি না হয়। কিছুদিন পর শম্পা দেবী খোঁজ নিতে এলে তাকে সরাসরি
মনীষার সাথে দেখা করতেব বারণ করে মিনতি। কি করবে সে? মায়ের মন হাজার হোক। এরপর কেটে
গেছে তিনটে বছর। নানা বিধিনিষেধের মধ্যে বড় হতে থাকে মনীষা । হঠাৎ একদিন মিনতি লক্ষ্য
করেন যে তার মেয়ের প্রাণোচ্ছল ভাবটা যেন যত
দিন যাচ্ছে কমে আসছে। ছোট্ট মেয়েটাকে কেমন ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে দেখতে লাগে এখন। সঙ্গে
সারাক্ষণ ঝিমুনি ভাব। মিনতি ভীষণ ভয় পেয়ে যায়।
একদিন স্বামী আর সে দুজনে মিলেই মেয়েকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু প্রাথমিক ভাবে দেখার পর কিছু ভিটামিন ও আয়রণ ট্যাবলেট
দেন মনীষার জন্য।দুসপ্তাহ পর আবার যেতে বলেন কিছু টেস্ট করাতে। অবশেষে বিভিন্ন রোগের
পরীক্ষা নিরিক্ষার পর জানা যায় ছোট্ট মনীষা থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত । মাথায় আকাশ
ভেঙে পড়ে মিনতির ।সে বুঝতে পারে না কার দোষে এইরকম পরিণতি হোল তার একমাত্র মেয়ের। ডাক্তারবাবু
জানান থ্যালাসেমিয়া একটি জিনঘটিত রোগ। সাধারনত মা বাবার থেকে এই রোগ সন্তানের হয়। ডাক্তারবাবুর
পরামর্শেই মিনতি ও তার স্বামী ব্লাড টেস্ট
করান। রিপোর্ট এলে জানা যায় দুজনেই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। ডাক্তারবাবু বলেন দেখেছেন
আমরা না জেনেই সন্তানের কত বড় ক্ষতি করে ফেলি অনেক সময়। বিয়ের আগে আমাদের ছেলে মেয়ে
উভয়েরই জেনে নেওয়া উচিত যে সে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিনা। যদি পাত্র পাত্রীর মধ্যে
শুধু একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয় তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু দুজনেই এই রোগের বাহক হলে
সন্তান এর এই রোগ হয়। যাই হোক ভেঙ্গে পড়বেন না । আপনার মেয়েকে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন
নেই। তবে সারাজীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। বাদ দিলে চলবে না। ডাক্তার বাবুর কথামত ওষুধ
সব কিনে মেয়েকে নিয়ে স্বামীর সাথে বাড়ি ফেরে মিনতি। সেদিন বিকেল হতে না হতেই মিনতি মেয়েকে নিয়ে শম্পা দেবীর ফ্ল্যাটের সামনে যায়।
কলিং বেলে হাত রাখে । আজ যে তাকে শম্পা দেবীর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে , সে যে নিজের
ভুল বুঝতে পেরেছে । সে যে বুঝতে পেরেছে জগতে পয়া অপয়া বলে কিচ্ছু হয় না। মানুষের অজ্ঞতা
ই মানুষের জীবনে অভিশাপ ডেকে আনে।
Bhalo laglo. Chotto Golper modhye die ek jotil samajik somosya tule dhorecho .
ReplyDeletethank you for your appreciation.
DeleteGood
ReplyDeletethank you.
Delete